বর্তমানে টেক ইন্ডাস্ট্রির সব থেকে হট নিউজ “টেক জায়ান্ট গুগল হুয়াওয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে” এর ফলে হুয়াওয়ের ডিভাইস গুলো এন্ড্রয়েড এর পরবর্তী ভার্ষনের আপডেট গুলো আর পাবে না তবে আরো ভয়ংকর ব্যাপারটি হলে সামনের দিনে হুয়াওয়ের নতুন যে মোবাইল গুলো মার্কেটে আসবে তাতে গুগল প্লেস্টোর, গুগল ম্যাপ, ইউটিউব জিমেইল এর মত জনপ্রিয় অ্যাপগুলো থাকবে না। সন্দেহতীত ভাবে বলাযায়, এই ঘটনা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম স্মার্টফোন তৈরি প্রতিষ্টানের জন্য একটি বড় ধাক্কা।
এই পোষ্টটিতে আমি আজ যে সকল বিষয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি –
- কি কারনে গুগল হুয়াওয়েকে এন্ড্রয়েড এর সেবা না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ?
- হুয়াওয়ে কি পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে গুগল এর এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে ?
- হুয়াওয়ের ভবিষৎ কি হতে পারে?
- যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া আর কোন দেশগুলি হুয়াওয়ে বর্জন করেছে
তাহলে চলুন মূল আলোচনা শুরু করা যাক।
বর্তমান স্মার্টফোন মার্কেটশেয়ারের তথ্য অনুযায়ী, গ্লোবাল স্মার্টফোন মার্কেটে হুয়াওয়ের মার্কেট শেয়ার ১৯% । যা প্রথম স্থানে সাথা স্যামসং এর থেকে খুব বেশি দূরে নয়।

হুয়াওয়ের ডিভাইস বিক্রির হার সমান থাকলে ২০২০ সাল নাগাদ হুয়াওয়েরই হওয়ার কথা স্মার্টফোন মার্কেটের সবথেকে বেশি মার্কেট শেয়ার থাকা কোম্পানী। তবে হুয়াওয়ের সাথে গুগলের সম্পর্ক ছেদের ঘটনায় স্মার্টফোন মার্কেটে হুয়াওয়ে যে বড়সড় একটা ধাক্কা খেয়েছে তা বলাই যায়।
কেন গুগল হুয়াওয়ের মত প্রতিষ্টানকে সেবা দেয়া বন্ধ করলো?
হুয়াওয়েকে গুগল কেনো আর সেবা প্রদান করবে না এটার মূল কারন জানতে আমাদের যেতে হবে বেশ খানিকটা পিছনে।
১
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চায়নার সাম্প্রতিক কালের বানিজ্য যুদ্ধ সম্পর্কে আমরা অনেকেই জানি। এই যুদ্ধকে অনেকেই ৩য় বিশ্বযুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডেনাল্ড ট্রাম্প মনে করেন “যুক্তরাষ্ট্রের বাজার চীনের কাছে খুলে দেয়াটা ছিলো মারাত্বক ভুল” এর পিছনে তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের বানিজ্য ঘাটতি ছিলো ৮০০ বিলিয়ন ডলার (৮০,০০০ কোটি ডলার) এই বানিজ্য বৈষম্য দূর করতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রাতারাতি চীনা পন্যে ২০০ বিলিয়ন ডলার ট্যাক্স আরোপ করেন। চায়নাও পাল্টা ৬০ বিলিয়ন ডলার ট্যাক্স আরোপ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পন্যে। এর ফলে বছরখানেক ধরে চলতে থাকা কূটনৈতিক যুদ্ধ বানিজ্য যুদ্ধে রুপ নেয়।
২
এর আগে গত বছর ডিসেম্বরের ১ তারিখ কানাডা থেকে গ্রেফতার করা হয় হুয়াওয়ের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মেং ওয়ানঝু। যিনি হুয়াওয়ের কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতার মেয়ে। তার বিরুদ্ধে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে ৫জি প্রযুক্তির যন্ত্রাংশের ব্যবসা করার অভিযোগ আনা হয়।
৩
নাম উল্লেখ না করলেও যুক্তরাষ্ট্র কিছুদিন ধরে অভিযোগ করে আসছিলো চাইনিজ কিছু কোম্পানী যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে। তবে নাম উল্লেখ না করলেও এটা পরিষ্কার ছিলো চাইনিজ জায়ান্ট হুয়াওয়েই ছিলো এর টার্গেট। এপ্রিলের ৪ তারিখে আন্তর্জাতিক গনমাধ্যম রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয় “হুয়াওয়ে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে নিচ্ছে এ ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য এবং প্রমান আছে”।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৬ মে ২০১৯ যুক্তরাষ্ট্র অফিসিয়ালি হুওয়াওয়ে কে ব্লাকলিস্ট করে। এবং তার ঠিক ৩দিনের মাথায় গুগল ঘোষনা করে যে তারা হুয়াওয়কে আর এন্ড্রোয়েড সেবা প্রদান করবে না।
কি কি বিষয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে গুগল
এন্ড্রোয়েডের মালিকানাধীন প্রতিষ্টান গুগল সামনের দিন গুলোতে হুয়াওয়েকে এন্ড্রোয়েড ব্যবহার করতে না দেয়ার ঘোষনা দিয়েছে। ১৯মে রবিবার একটি বিবৃতির মাধ্যমে এমন সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছি প্রতিষ্টানটি। এই সিদ্ধান্তের ফলে এখন –
- গুগলের নিরাপত্তা বিষয়ক আপডেট এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা পাবেনা হুয়াওয়ে
- হুয়াওয়ের নতুন স্মার্টফোন গুলোতে থাকবে না ইউটিউব, গুগল ম্যাপ, প্লেস্টোর, ক্রোম ব্রাউজারের মত জনপ্রিয় অ্যাপ।
- তবে সচল থাকবে ওপেন সোর্স প্লাটফর্মে থাকা সফটওয়ার গুলো।
- এ তালিকায় পড়বে না হুয়াওয়ের বর্তমান গ্রহকরা।
- এমনকি হুয়াওয়ের যে মোবাইলফোন গুলো বাজারে আছে তাতেও এন্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম পাওয়া যাবে।
শুধু কি গুগল?
শুধু গুগল ই নয়, হুয়াওয়েবে মোবাইলের চিপ এবং মার্কিন এবং ইউরোপীয় প্রতিষ্টানগুলো সব ধরনের সরবরাহ স্থগিত করার ঘোষনা দিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে Intel, Qualcomm, Broadcom এর মত নামীদামী চিপ নির্মাতা প্রতিষ্টান। তবে ব্লুমবার্গের এই রিপোর্ট মতে পুরো ঘটনা হুয়াওয়ে আগেই আচ করতে পেরে তারা কমপক্ষে ৩ মাসের জন্য প্রয়োজনীয় চিপ মজুদ করে রেখেছে।
হুয়াওয়ে কি বলছে?
গুগল কতৃক নিষেধাজ্ঞা আসার পর পর ই জানা যায় যে হুয়াওয়ে তাদের নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম হংমেং নিয়ে কাজ করছে। এছাড়াও তারা তাদের বিরুদ্ধে আনীত গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
হুয়াওয়ে ব্যবহারকারীদের উপর এর প্রভাব কতটুকু পড়বে?
গুগল সম্প্রতি একটি টুইটে নিশ্চিত করেছে যে হুয়াওয়ের বর্তমান গ্রাহকরা কোনো সমস্যা ছাড়াই এন্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করতে পারবেন।

এছাড়াও গুগল প্লে, ক্রোম ব্রাউজার এবং গুগল ম্যাপের মত জনপ্রিয় ফিচার গুলো তারা ব্যবহার করতে পারবেন। তবে তারা এন্ড্রয়েড এর পরবর্তী ভার্ষনের আপডেট পাবেন না।
এ ঘটনার পর হুয়াওয়ে থেকে নিশ্চিত করা হয় যে তারা হুয়াওয়ে ডিভাইসে সিকিউরিটি এবং আপডেটের ব্যবস্থা করবে।
হুয়াওয়ের ভবিষৎ কি হতে পারে
স্মার্টফোন মার্কেটশেয়ারের গ্রোথ অনুয়ায়ী ২০২০ সাল নাগাদ হুয়াওয়ের সবথেকে বড় স্মার্টফোন কোম্পানী হওয়ার কথা। তবে সাম্প্রতিক এই ঘটনার পর যে সেটা হচ্ছে না তা কিছুটা ধারনা করা যায়। ওভারঅল মার্কেটের কথা হয়তো আরো কিছুদিন পরে বোঝা যাবে কিন্ত বাংলাদেশের মার্কেটে হুয়াওয়ে বিক্রির হার আশংকাজনক হারে কমে যেতে পারে বলে আমার মনে হচ্ছে। চীনে গুগলের বেশিরভাগ সার্ভিস ই বন্ধ থাকার কারনে এ ধাক্কা হয়তো চীনা মার্কেটে হুয়াওয়ের জন্য সমস্যা হবে না। তবে এশিয়া এবং ইউরোপের মত দেশে তারা এটি কিভাবে সামাল দেয় তাই দেখার বিষয়।

চীনা দেশপ্রেম এবং অ্যাপল পন্য বর্জনের ডাক
হুয়াওয়ে নিষিদ্ধ ইশ্যুতে চীনা নাগরিকরা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে তারা অ্যাপল পন্য বর্জনের ডাক দিয়েছেন। গত বছর ডিসেম্বরে হুয়াওয়ের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মেং ওয়ানঝু কে গ্রেফতার করার পর একবার অ্যাপল পন্য বর্জনের ডাক দেয়া হয়েছিলো। তবে এবারের পরিস্থিতি তার থেকেও ভিন্ন।
অবশ্য চীনে ইউটিউব, ফেসবুক, গুগল, টুইটারের মত জনপ্রিয় মার্কিন ওয়েবসাইটে অনেক আগে থেকেই বন্ধ আছে।
যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া আর কোন দেশগুলি হুয়াওয়ে বর্জন করেছে
যুক্তরাষ্ট্যই যে একমাত্র হুয়াওয়েকে ব্লাকলিস্ট করেছে ব্যাপারটা এমন নয়। এর আগে থেকেই ৫জি সম্প্রসারনে হুয়াওয়ে প্রযুক্তি ব্যাবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলো অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্যের মত দেশগুলো।
মোবাইল ডিভাইসের বাইরে নেটওয়ার্ক সম্প্রসার ব্যবসায় অনেকদিন ধরে কাজ করছে হুয়াওয়ে। ২০১৫ সাল থেকে বিশ্বের বৃহত্তম টেলিকম নেটওয়ার্ক যন্ত্রপাতি নির্মাতা প্রতিষ্টান হুয়াওয়ে।
হুয়াওয়েকে অনেক আগে থেকেই পশ্চিমা এবং ইওরোপিয়ান দেশগুলো গুপ্তচর হিসেবে সন্দেহ করে আসছে। ধারনা করা হয়ে থাকে চীনা সরকারের চাপে তারা বিদেশি টেলিকম সিস্টেমে আড়ি পাতে। সন্দেহের মূলে বলা হয় হুয়াওয়ের প্রতিষ্ঠাতা রেন ঝেংফেই ১৯৮৭ সালে হুয়াওয়ে প্রতিষ্ঠার আগে সেনাবাহিনীতে বেশ বড় পদে চাকুরীরত ছিলেন।
তাই বলা যায় হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি এবং তথ্য পাচারের অভিযোগ নতুন নয়।
এখন এটিই দেখার বিষয় যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া ধাক্কা চীন এবং গুগলের দেয়া ধাক্কা হুয়াওয়ে কিভাবে সামাল দেয়।
আমার দেয়া তথ্যগুলি ভালো লেগে থাকলে সবাইকে শেয়ার করার অনুরোধ রইলো। এছাড়া কমেন্টের মাধ্যমে আপনি আপনার মতামত জানাতে পারেন। ধন্যবাদ সম্পূর্ন পোষ্টটি পড়ার জন্য।
Dipu Roy
good info
Miraj Selim
Thanks for your post.